Dhaka 8:31 pm, Friday, 26 June 2026

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • Update Time : 09:37:02 am, Friday, 26 June 2026
  • / 9 Time View

একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অগ্রযাত্রার অন্যতম ভিত্তি ছিল কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় এসে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের সমালোচনা উপেক্ষা করেও তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেন। তার মতে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সেই নীতির সুফল এখনো ভোগ করছে মালয়েশিয়া।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের প্রত্যাশা তৈরি হলেও, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশে মব কালচার ও আইনহীনতার বিভিন্ন ঘটনা সামনে আসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, সচিবালয় থেকে শুরু করে শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও অস্থিরতা দেখা দেয়, যা জনজীবন ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে শান্তি, নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রত্যাশায় জনগণ বিএনপিকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিলেও এখনো পুরোপুরি কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ। তবে গত তিন মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও তারা মনে করেন।

এদিকে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলা এবং ২ হাজার ২১৪টি চুরির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি (বিসিআরএস)। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড, ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই এবং ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৫ হাজার ৯৯৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের রেখে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একাংশ সরকারের নীতি বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আন্তরিক নন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে বিচার বিভাগের সংস্কার কার্যক্রমও প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এরই মধ্যে গত ২৩ জুন আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী ১৮ জন আইন কর্মকর্তা—৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল—একযোগে পদত্যাগ করায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসাবান্ধব ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্প-কারখানায় অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি কিংবা সাংবাদিকদের ওপর হামলার মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনারও তাগিদ দিয়েছেন তারা।

বিশেষ করে গত ২৩ জুন রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে অপরাধ দমনে আরও কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে। কারণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

Tag :

Please Share This Post in Your Social Media

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

Update Time : 09:37:02 am, Friday, 26 June 2026

একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা অপরিহার্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর অগ্রযাত্রার অন্যতম ভিত্তি ছিল কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।

আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় এসে অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের সমালোচনা উপেক্ষা করেও তিনি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেন। তার মতে, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনাই সফল হতে পারে না। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সেই নীতির সুফল এখনো ভোগ করছে মালয়েশিয়া।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের প্রত্যাশা তৈরি হলেও, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে দেশে মব কালচার ও আইনহীনতার বিভিন্ন ঘটনা সামনে আসে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ, সচিবালয় থেকে শুরু করে শিল্প ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও অস্থিরতা দেখা দেয়, যা জনজীবন ও অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এমন প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে শান্তি, নিরাপত্তা ও সুশাসনের প্রত্যাশায় জনগণ বিএনপিকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেয়। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিলেও এখনো পুরোপুরি কাঙ্ক্ষিত অবস্থায় পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণ। তবে গত তিন মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও তারা মনে করেন।

এদিকে সরকারের প্রথম ১০০ দিনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলা এবং ২ হাজার ২১৪টি চুরির ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ৩ হাজার ৪৯৬টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ধর্ষণের ঘটনাও রয়েছে।

একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সিভিল রাইটস সোসাইটি (বিসিআরএস)। সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ড, ৩৪৭টি অপহরণ, ১৮৪টি ছিনতাই এবং ৫৯১টি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ৫ হাজার ৯৯৮টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকারের উদ্যোগ থাকা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের রেখে যাওয়া প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সিভিল প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একাংশ সরকারের নীতি বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আন্তরিক নন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে বিচার বিভাগের সংস্কার কার্যক্রমও প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতগুলোতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। এরই মধ্যে গত ২৩ জুন আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনকারী ১৮ জন আইন কর্মকর্তা—৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল—একযোগে পদত্যাগ করায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা ও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসাবান্ধব ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। শিল্প-কারখানায় অগ্নিসংযোগ, চাঁদাবাজি কিংবা সাংবাদিকদের ওপর হামলার মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনারও তাগিদ দিয়েছেন তারা।

বিশেষ করে গত ২৩ জুন রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের মতে, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারকে অপরাধ দমনে আরও কঠোর ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে। কারণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়ন ছাড়া দেশের টেকসই উন্নয়ন ও দীর্ঘমেয়াদি অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।