জমির মালিকের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটে ১৫% কর
নতুন অনিশ্চয়তার মুখে আবাসন বাজার
- Update Time : 11:35:03 am, Wednesday, 24 June 2026
- / 18 Time View
আব্দুর রাজ্জাক
সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট, রিহ্যাব
বাংলাদেশের আবাসন খাত বর্তমানে এমন একটি সময় অতিক্রম করছে, যখন নীতিগত স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এই সময়ে জমির মালিকদের প্রাপ্ত ফ্ল্যাটের ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব শুধু নতুন করের বিষয় নয়; এটি বাজারে একটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে।
যেকোনো অর্থনীতিতে বিনিয়োগের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা (Policy Predictability)। একজন জমির মালিক ও একজন ডেভেলপার যখন একটি প্রকল্পে অংশীদার হন, তখন তারা সাধারণত ৩ থেকে ৫ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোন। কিন্তু প্রকল্পের মাঝপথে বা বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে নতুন করের বোঝা যুক্ত হলে পুরো আর্থিক হিসাব-নিকাশ পরিবর্তিত হয়ে যায়।
আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই করের দায় কে বহন করবে?
জমির মালিক বলবেন, তিনি কর দেওয়ার জন্য নগদ অর্থ পাননি। ডেভেলপার বলবেন, চুক্তির সময় এই কর ছিল না। ব্যাংক বলবে, এটি তাদের অর্থায়নের অংশ নয়। ফলে শুরু হবে দায় ঠেলাঠেলি। এর ফলে বহু প্রকল্পে ফ্ল্যাট হস্তান্তর বিলম্বিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
আমাদের আশঙ্কা, ১ জুলাইয়ের পর অনেক প্রকল্পে নতুন ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা দেখা দিতে পারে। কর নির্ধারণের ভিত্তি কী হবে? বাজারমূল্য, নাকি চুক্তিমূল্য? ফ্ল্যাটের মূল্য কে নির্ধারণ করবে? মূল্যায়ন নিয়ে আপত্তি উঠলে তার নিষ্পত্তি কোথায় হবে? এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
ফলে কর আদায়ের আগে কর বাস্তবায়নের কাঠামো নিয়েই নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে যৌথ উন্নয়ন পদ্ধতি সবচেয়ে কার্যকর মডেল। পুরান ঢাকা, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার পুরোনো ভবন এই মডেলের মাধ্যমে আধুনিক ও নিরাপদ ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে।
যদি জমির মালিকরা মনে করেন যে উন্নয়ন চুক্তির শেষে তাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা আসবে, তাহলে তারা পুনঃউন্নয়ন কার্যক্রম থেকে সরে যেতে পারেন। এর ফলে শুধু আবাসন খাত নয়, নগর নিরাপত্তা ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হবে।
আমরা মনে করি, রাষ্ট্রের রাজস্ব প্রয়োজন আছে। কিন্তু রাজস্ব আহরণের পদ্ধতি এমন হওয়া উচিত, যাতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিরুৎসাহিত না হয়।
এই ক্ষেত্রে কয়েকটি বিকল্প সমাধান বিবেচনা করা যেতে পারে।
প্রথমত, ফ্ল্যাট হস্তান্তরের সময় নয়, বরং বিক্রয়ের সময় কর আরোপ করা যেতে পারে। কারণ তখন প্রকৃত অর্থে আর্থিক লেনদেন সংঘটিত হয়।
দ্বিতীয়ত, যদি সরকার কর আরোপ করতেই চায়, তাহলে একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, নিজ বসবাসের জন্য প্রাপ্ত ফ্ল্যাটকে করমুক্ত রাখা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, এককালীন করের পরিবর্তে ধাপে ধাপে বা কিস্তিভিত্তিক পরিশোধের সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে।
চতুর্থত, এই নীতির বাস্তব প্রভাব মূল্যায়নের জন্য সরকার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, রিহ্যাব, জমির মালিক প্রতিনিধি ও অর্থনীতিবিদদের সমন্বয়ে একটি যৌথ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
আমরা বিশ্বাস করি, আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধান বের করা সম্ভব, যেখানে সরকার রাজস্বও পাবে এবং আবাসন খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
বর্তমানে সবচেয়ে প্রয়োজন সংঘাত নয়, সংলাপ; অনিশ্চয়তা নয়, স্পষ্টতা; এবং অতিরিক্ত করের চাপ নয়, বিনিয়োগবান্ধব নীতি।
কারণ আবাসন খাতের গতি কমে গেলে তার প্রভাব শুধু ডেভেলপার বা জমির মালিকের ওপর পড়ে না; এর প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতি, নগর উন্নয়ন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর।
সুতরাং এখনই সময় বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে একটি বাস্তবসম্মত, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগিয়ে যাওয়ার।



















