Friday , April 19 2024

চর্চাহীন-জ্ঞানহীনদের দিয়ে রাজনীতি হয় না

প্রসেনজিৎ হালদার:

এই জামানায় মুখে মুখে গণতন্ত্র, রাজনীতি, ভোট, নির্বাচন ইত্যাদি শব্দ শোনা যায়। স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র পরিচালনার সুষ্ঠু নীতিই গণতন্ত্র-রাজনীতি। প্রাচীন গ্রীস থেকে উঠে আসা শব্দটি এবং এর ব্যবহার ছড়িয়েছে বিশ্বব্যাপী। গণতন্ত্র জনপ্রিয় এবং বহুল প্রচলিত শাসন ব্যবস্থাও বটে। চীন-কোরিয়া, আরবের মতো অল্প কিছু দেশ বাদ দিয়ে প্রায় সবাই গণতন্ত্রের অনুসারী। সমতা, সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা, রাষ্ট্র প্রদত্ত অধিকার নাগরিকদের মধ্যে সুষম বণ্টন করাই গণতন্ত্র-রাজনীতি। মোদ্দা কথায়, জনগণের খেদমত করাই রাজনীতি, গণতন্ত্র।

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ খুব সহজেই বলে দিচ্ছে, ‘গণতন্ত্র বলতে কোনও জাতিরাষ্ট্রের (অথবা কোনোও সংগঠনের) এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝায় যেখানে নীতিনির্ধারণ বা সরকারি প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিক বা সদস্যের সমান ভোটাধিকার থাকে।’ “বাংলা ‘গণতন্ত্র’ পরিভাষাটি ইংরেজি ডেমোক্রেসি (উবসড়পৎধপু) থেকে এসেছে। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতকে অ্যাথেন্স ও অন্যান্য গ্রিক নগররাষ্ট্রে বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বোঝাতে শব্দটির প্রথম ব্যবহার হয়। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে ক্লিসথেনিসের নতুন ধরনের সরকার চালু হয় এবং সেই সঙ্গে বিশ্বের প্রথম গণতন্ত্র সৃষ্টি হয় গ্রিসের ছোট শহর-রাষ্ট্র এথেন্স।’ আড়াই হাজার বছরে নানান চড়াই-উৎরাই পার করে গণতন্ত্র, রাজনীতি বর্তমানে কি পরিস্থিতিতে আছে; তাই পর্যবেক্ষণের বিষয়।

বিশ্বের অনেক দেশ গণতান্ত্রিক বিধানে চলে, রাজনীতি করে আগ্রহীরা। বড় দেশগুলোতেও যেমন, ছোট দেশগুলোও এই শাসন ব্যবস্থায় বিশ্বাসী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারতের মতো দেশও গণতন্ত্রনির্ভর। যুক্তরাজ্য রাজাদের দেশ হলেও সেখানে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বিদ্যমান। প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে জনগণ জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করেন, এই জনপ্রতিনিধিগণই নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নাগরিকদের সেবা দেন। ভালো-মন্দের বিচারে ভোটের মাধ্যমে পরবর্তীতে তাকে অপসারণের ব্যবস্থাও থাকে। দেশে দেশে এভাবেই চলে গণতন্ত্র, রাজনীতি।

সহজ মনে হলেও অত্যন্ত জটিল এই পদ্ধতি বা ব্যবস্থা। এরপর সুন্দর রাজনৈতিক পরিবেশ ও সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দেখা দেয় বড় বড় বিপত্তি। মুক্ত বাকস্বাধীনতা, মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন, হরতাল, অবরোধ ইত্যাদি শব্দদয় গণতন্ত্র-রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। বোঝা যায়, গণতন্ত্র শব্দটি যত সহজে বলা যায়, এর ভেতরের যা আছে তা এতো সহজ নয় বরং অতিবৃহৎ।

স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর সবকটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ হয়নি। এমনকি দেশে স্বৈরতন্ত্রেরও আবির্ভাব হয়েছে। কিন্তু, ঘাত-প্রতিঘাত আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে সকল বাধা টপকে দ্বাদশ নির্বাচনের পথে দেশ।

বাংলাদেশে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), জাতীয় পার্টি (জাপা) ইত্যাদি। এর বাইরে আরও রাজনেতিক দল রয়েছে, তবে তাদের কার্যক্রম ব্যাপক নয়। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি অনেক আগে থেকেই বিরোধীই শুধু নয়, প্রকাশ্য শত্রু। অন্যদিকে জাপা কিংবা আরও যে দলগুলো রয়েছে তারা নামমাত্র টিকে থাকে। কিন্তু, প্রতিটি নির্বাচনেই উক্ত রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ ছিল, এবারও থাকবে।

গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোই জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীপরিষদ গঠন করে। সংসদীয় পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে অগ্রবর্তী হন রাজনৈতিক দলের নেতারা। আইনবিভাগের দায়িত্বে থাকা রাজনীতিবিদদের কাজ হলো, সংসদে বসে দেশ তথা দেশের মানুষের কি করলে উপকার হয়, উন্নতি হয় তা নিশ্চিত করা, নির্ধারণ করা। বাংলাদেশ, ভারত, যুক্তরাষ্ট্রেও এমনটিই হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিদ্ধস্ত বাংলাদেশ সোনার বাংলায় রূপান্তর করতে চেয়েছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু, ১৯৭৫ এর আগষ্টের পর সে স্বপ্ন ফিঁকে হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে স্বাধীনতার বিপক্ষে থাকা রাজনৈতিক দল এমনকি স্বৈরতন্ত্রও প্রভাব বিস্তার করে। যে কারণে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পিছিয়ে যায় অনেকটা।

বর্তমান প্রেক্ষাপট খেয়াল করলে দেখা যায়, একটা পক্ষ ক্ষমতায় আছে দীর্ঘকাল, অন্য পক্ষ নেই। যুগের পর যুগ দেশের মানুষ দেখছে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে বিএনপির করুণ পরিস্থিতি হয়। অন্যদিকে, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের নাম মুছে ফেলতে সচেষ্ট হয়। অর্থাৎ এদেশে এখনো শত্রুতার রাজনীতি চলমান।

বিগত পঞ্চাশোর্ধ বছরের হিসাব-নিকাশ করলে যে তথ্য মেলে তাও রীতিমতো ভয়ানক। এখানে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালাতে জনগণের ভোটের চাইতে বেশি প্রয়োজন নেতাকর্মীদের যোগসাজস, তোষামোদ আর অপপ্রচার চালানোর কৌশল রপ্ত করা। কোন রাজনৈতিক দলই এই বলয় থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেনি। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে অনেকগুলো দল জোটবদ্ধ হয়েও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় একক দলকে হটাতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু, ক্ষমতার রাজনীতি থেকে কেউ বেড়িয়ে আসতে পারেনি। অনিয়ম, দুর্নীতি অনেকের ছায়াসঙ্গী।

অতীতে দেশ ও দেশের জনগণের মঙ্গল করতে যেসব রাজনৈতিক দল ব্যর্থ হয়েছে, তাদের সকলেই পতিত হয়েছে। ক্ষমতার বাইরে গিয়ে তখন তাদের আরও বিপত্তি বেধেছে। আমরা দেখেছি, গণতান্ত্রিক ক্ষমতা পেয়ে, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে অনেক রাজনীতিবিদ বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারও করেন অনেকে। বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের নামে এমন হাজারও অভিযোগ পাওয়া যাবে। কিন্তু, তাদেরও ক্রান্তিকাল আসে। হয়তো বয়সে, নয়তো অন্যায় অপরাধের শাস্তিতে। জেলের ঘানি থেকে ফাঁসি পর্যন্ত যে হয় কলুসিত রাজনীতিবিদদের। কিন্তু, কোনভাবে কিছুটা ভালো করতে পারলেও শুধু দেশ নয় বিশ্বব্যাপি সেই রাজনীতিকের নাম ছড়ায়।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জেল-হাজতে যাওয়ার দৃষ্টান্ত ডাল-ভাত। একুশ শতকের তৃতীয় দশকে চলমান দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী অপরাধে জড়িয়েছেন, তাদের নামে মামলা চলছে, হচ্ছে বিচার। জেলে থেকেই কাটছে নির্বাচনী সময়। বিষয়টি যেন সব পক্ষে কাছেই সহজ-সরল। মামলা, জেল, সাজা রাজনীতিবিদদের কাছে মামুলি।

রাজনৈতিক ব্যক্তি হবেন সাধারণ মানুষের নেতা, জনগণের নেতা। তিনি সর্বপ্রথম খেয়ালে রাখবেন অবহেলিত জনগণকে। ক্ষমতায় আসীন হয়ে এটিই তার প্রধান কাজ। কিন্তু, প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর আমাদের বেশিরভাগ সংসদ সদস্য এই সারতত্ত্ব ভুলে যান। এরপর তাদের হাত দিয়ে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অনিয়ম শুরু হয়। বিধি অনুযায়ী পাঁচ বছর এভাবে চলে। যে সংসদ সদস্য পাঁচ বছরে নির্বাচনী এলাকায় সাধারণ মানুষের উপকার করেন তার পরেরবার নির্বাচিত হওয়া সম্ভাবনা থাকে। উল্টোদিকে যারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, অন্যায়-অপকর্মে যুক্ত হন তারা ভোটের মাঠে পরাজিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন। তখন, সাধারণ মানুষও তাদের গালিগালাজ, অসম্মান করেন।

গত তিনটি নির্বাচনে টানা জয়লাভ করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শে গড়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তাঁর যোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা এই দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী। তিনি দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তাতে সন্দেহ নেই। গোটা পরিবার নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হলেও তিনি দেশের মানুষকে ভালোবাসতে ভুলে যাননি। পৈশাচিক ওই হত্যাযজ্ঞের পর গোটা দেশ যখন শত্রু হওয়ার কথা ছিল তখন শেখ হাসিনা দেশকে টেনে তুলতে দীর্ঘ সময় পর দেশে ফেরেন, রাজনীতির হাল ধরেন। এরপর বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে থাকে।

এখন দেশে যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চলমান তার পুরো অংশটিই আওয়ামী লীগের কৃতিত্ব। এখানে বলে রাখা ভালো যে, যদি দেশের উন্নয়ন হয় তাহলে সে দায় ক্ষমতাসীনদের। আর যদি দেশে অন্যায়, অপকর্ম বেড়ে যায় তাহলেও তার ফল ক্ষমতাসীনদের ঘাড়েই বর্তায়। আর তাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সজাগ থাকার বিকল্প নেই। অতীতের সকল নির্বাচনকে টপকে গেছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আনুষ্ঠানিকতা কিংবা বিদেশীদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে কড়াভাবে। বাংলাদেশের ভোট নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও চুলচেড়া বিশ্লেষণ হচ্ছে। অনেক রাষ্ট্র বিধিনিষেধের হুমকি দিচ্ছে। নির্বাচনে কোন ধরণের অনিয়ম হলে তা মেনে নেওয়া হবে না বলেও জানানো হচ্ছে। কিন্তু, যথাসময়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার নিশ্চয়তা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এখন দেখা বিষয়, কোথাকার পানি কোথায় গিয়ে গড়ায়।

২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তোলেন। ‘রাতের ভোট’ আখ্যা দিতেও ছাড়েন না বিরোধী পক্ষ। কিন্তু, কিছু একটা তো হয়েছিল অবশ্যই যে কারণে নানানজন একই কথা বলে। আর তাই ২০২৪ সালের ভোট নিয়ে সব পক্ষের মাথা ব্যাথা রয়েছে। কোনভাবে এই নির্বাচনে কারচুপি কিংবা অনিয়ম হলে সে দায় নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে। বিষয়টি নিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতিও অনেক আগে থেকেই প্রস্তুত। সবার ধারণা, তিনি অবশ্যই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোটের আয়োজন করবেন।

সোজা কথা, রাজনীতিবিদদের চর্চার অভাব। রাজনীতি করেও গণতন্ত্র নিয়ে তাদের ধোয়াশা রয়েছে। অনেকেই বুঝতে অক্ষম, রাজনীতির ময়দানে বিরোধীপক্ষ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কেবল বিরোধীদের মাধ্যমেই ক্ষমতাসীনদের ভুল-ত্রুটি ধরা পরে। কিন্তু, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা বিরোধী হয়েছেন, তাদের শক্তি এবং কৌশল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। জাতীয় পার্টির মতো দল বিরোধী হয়েও আসন সমঝোতায় বসে। একসময় জোটে থাকলেও এখন নেই বলে জানান কর্তাব্যক্তি। রাজনীতির ক্ষমতা ধরতে রাঘববোয়ালদের কত কাঠ-খড়-তেল পোড়াতে হয় তা রুদ্ধদ্বার টেবিলেই আটকে থাকে, সাধারণ মানুষের তা গোচরে আসে না। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাধারণ জনগণ সকল ক্ষমতার শীর্ষে থাকলেও ভোট শেষে তাদের আর খোঁজ থাকে না।

আজ যে প্রার্থীরা প্রচারণায় নেমেছেন ভোটে জিতে গেলে রাজধানী হয় তাদের প্রথম বাড়ি। লাল-নীল-হলুদ বাতির এই শহর হয় আপন ঠিকানা। কিসের গ্রাম, কিসের ভোটার? এই প্রশ্নটি মুখে আনার সময় থাকে না। ভোটারদেরও কিছু করার নেই। পাঁচ বছর সহ্য করতেই হবে। সত্য হলো- গণতান্ত্রিক চর্চাহীন, জ্ঞানহীন মানুষ যতকাল রাজনীতি নিয়ে থাকবেন, ততকাল প্রজাতান্ত্রিক দেশের মানুষের মুক্তি নেই।

About somoyer kagoj

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *